ফিতনা আসার আগেই নেক আমলে ধাবিত হোন: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা

হাদীস প্রকাশিত October 28, 2026

ফিতনা আসার আগেই নেক আমলে আত্মনিয়োগ করুন

পৃথিবীতে মানুষের জীবন সব সময় এক রকম থাকে না। কখনো আসে স্বস্তি, কখনো সংকট; কখনো ঈমানের ওপর অটল থাকা সহজ হয়, আবার কখনো ফিতনা-ফাসাদের কারণে দ্বীনের ওপর অবিচল থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সুযোগ থাকতে নেক আমলে মনোযোগী হওয়া প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

অন্ধকার রাতের মতো ফিতনা আসার আগেই আমল করুন

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন—

“অন্ধকার রাতের মতো ফিতনা আসার আগেই তোমরা নেক আমলের প্রতি ধাবিত হও। তখন সকালে একজন মুমিন থাকবে, অথচ সন্ধ্যায় সে কাফির হয়ে যাবে; কিংবা সন্ধ্যায় মুমিন থাকবে, অথচ সকালে কাফির হয়ে যাবে। সে দুনিয়ার সামগ্রীর বিনিময়ে নিজের দ্বীন বিক্রি করে দেবে।”

— সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৮ (প্রচলিত নম্বরায়নের একটি); মূল হাদিসের নম্বর সংস্করণভেদে ভিন্ন হতে পারে।

এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের সতর্ক করেছেন যে, এমন সময় আসতে পারে, যখন ফিতনার প্রভাবে মানুষের ঈমান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দুনিয়ার স্বার্থ, সম্পদ, মর্যাদা কিংবা প্রবৃত্তির অনুসরণে মানুষ নিজের দ্বীন হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। তাই ফিতনা ছড়িয়ে পড়ার আগেই নেক আমলে অভ্যস্ত হওয়া এবং ঈমানকে দৃঢ় করা জরুরি।

সাতটি বিষয় আসার আগেই নেক আমলে এগিয়ে যান

রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, সাতটি বিষয়ের আগেই তোমরা নেক আমল করতে দ্রুত অগ্রসর হও। বিষয়গুলো হলো—

১. দারিদ্র্য: এমন দারিদ্র্য, যা মানুষকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে দিতে পারে।

২. প্রাচুর্য ও ঐশ্বর্য: এমন সম্পদশালী অবস্থা, যা মানুষকে অহংকারী ও উদ্ধত করে তোলে।

৩. কঠিন অসুস্থতা: এমন রোগ, যা মানুষকে দুর্বল ও জরাজীর্ণ করে দেয়।

৪. বার্ধক্য: এমন বার্ধক্য, যা মানুষের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

৫. আকস্মিক মৃত্যু: যে মৃত্যু কোনো পূর্বসংকেত ছাড়াই এসে মানুষের দুনিয়ার জীবন শেষ করে দিতে পারে।

৬. দাজ্জালের আবির্ভাব: দাজ্জালের ফিতনা, যা হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।

৭. কিয়ামত: সেই মহাপ্রলয়, যা হবে অত্যন্ত বিভীষিকাময় ও কঠিন।

— জামে আত-তিরমিযি, হাদিস: ২৩০৬; অধ্যায়: যুহদ।

এই বিষয়গুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, নেক আমল করার সুযোগ চিরস্থায়ী নয়। দারিদ্র্য ও প্রাচুর্য, সুস্থতা ও অসুস্থতা—জীবনের প্রতিটি অবস্থাই মানুষের জন্য পরীক্ষা। তাই সুযোগ থাকা অবস্থায় সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দান-সদকা, তাওবা এবং মানুষের অধিকার আদায়ের প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত।

ফিতনার সময় ইবাদতের বিশেষ গুরুত্ব

রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—

“ফিতনার সময় ইবাদত করা আমার দিকে হিজরত করার মতো।”

— সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৪৮।

ফিতনা-ফাসাদের সময় মানুষ যখন নানা বিভ্রান্তি, অস্থিরতা ও দুনিয়ামুখী ব্যস্ততায় নিমগ্ন হয়ে পড়ে, তখন আল্লাহর ইবাদতে অবিচল থাকা বিশেষ মর্যাদার কাজ। এমন পরিস্থিতিতে নিজের ঈমান রক্ষা করা, ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করা এবং পাপ থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ কথা

আমরা কেউ জানি না, আগামীকাল আমাদের জীবনে কী ঘটবে। কখন সুস্থতা অসুস্থতায় রূপ নেবে, কখন সম্পদ কমে যাবে কিংবা কখন মৃত্যুর ডাক এসে পৌঁছাবে—তা একমাত্র আল্লাহই জানেন।

তাই নেক আমলকে ভবিষ্যতের জন্য ফেলে না রেখে আজ থেকেই শুরু করা উচিত। আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তাওবা করা, ফরজ ইবাদতে যত্নবান হওয়া এবং সব ধরনের ফিতনা থেকে ঈমান রক্ষার চেষ্টা করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

দোয়া: হে আল্লাহ! আমাদের ঈমানের ওপর অটল রাখুন, সব ধরনের ফিতনা থেকে হেফাজত করুন এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

হাদীস এ আরও

শহীদ হয়েও জাহান্নামী! খাইবার যুদ্ধের এক ভয়ঙ্কর শিক্ষা

খাইবারের যুদ্ধে সাহাবিদের মধ্য থেকে যারা শহীদ হয়েছিলেন, তাদের অনেকেই শহীদ হিসেবে অভিহিত করছিলেন। কিন্তু যখন এক ব্যক্তির ব্যাপারে বলা হলো যে তিনি শহীদ, তখন রাসূ…

নেশাখোর সাহাবীর প্রতি রাসূল (সাঃ)-এর ভালোবাসা ও আমাদের শিক্ষা

মদিনায় একজন সাহাবী ছিলেন, যার নাম ছিল আব্দুল্লাহ এবং সবাই মজা করে তাকে "হিমার" (গাধা) বলে ডাকতো। তিনি প্রায়ই মদ পান করতেন। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তাকে প্রায়ই রাস…

খাওয়ার সময় কি আমরা শয়তানকে শরীক করছি? জেনে নিন হাদিসটি

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "শয়তান ঐ খাবারকে নিজের জন্য হালাল মনে করে যার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা হয়নি।" (সহিহ মুসলিম) ​সংক্ষিপ্ত শিক্ষা: খাবার বা পানীয় গ্…

কবর সম্পর্কে তিনটি মৌলিক হাদিস ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

মৃত্যু প্রতিটি মানব জীবনের এক অবশ্যম্ভাবী সত্য। মৃত্যুর পর মানুষের যে নতুন জগতের যাত্রা শুরু হয়, তার প্রথম ধাপই হলো কবর। হাদিস শরিফে কবর সম্পর্কে বহু গুরুত্বপূ…